Wednesday, December 5, 2012

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলো অমুসলিম শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট করছে


পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলো অমুসলিম শিক্ষার্থীদেরকে আকৃষ্ট করছে

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য-পরিচালিত মাদ্রাসাগুলো আধুনিক পাঠক্রম চালু করার সাথে সাথে, এগুলো কেবল এই উপমহাদেশের মুসলমান স্কুলগুলো সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিচ্ছে না ৷ বরং সেইসাথে এগুলো ইসলাম ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীদেরকেও আকৃষ্ট করতে শুরু করেছে ৷

পশ্চিমবঙ্গের অরগ্রাম থেকে লিখেছেন শাইখ আজিজুর রহমান

ডিসেম্বর 06, 2012
এখন সকাল ১০:৩০ এবং কোলকাতা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত অরগ্রামের চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসার ঘন্টা বাজছে, যা স্কুল দিবস শুরু হওয়ার সংকেত দিচ্ছে ৷
  • কোলকাতা থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত অরগ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসায় লাবণী ব্যানার্জি একটি কম্পিউটার ক্লাস করছেন ৷ তিনি এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত অনেক অমুসলিম শিক্ষার্থীর একজন ৷ [শাইখ আজিজুর রহমান/খবর] কোলকাতা থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত অরগ্রাম চতুষ্পল্লী হাই মাদ্রাসায় লাবণী ব্যানার্জি একটি কম্পিউটার ক্লাস করছেন ৷ তিনি এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত অনেক অমুসলিম শিক্ষার্থীর একজন ৷ [শাইখ আজিজুর রহমান/খবর]

নীল ও সাদা ইউনিফর্মে সজ্জিত হয়ে ছেলে-মেয়েরা মাদ্রাসার আঙিনায় সমবেত হয়, প্রাত্যহিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, যার মধ্যে রয়েছে ভালোভাবে লেখাপড়া করা, ভালো নাগরিকে পরিণত হওয়া এবং তাদের দেশের সেবা করার জন্য শপথ নেয়া ৷ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে সকালের সমাবেশ শেষ হয় ৷
অরগ্রাম মাদ্রাসায় ক্লাস শুরু হওয়ার আগের কর্মসূচিগুলো ভারতের বেশিরভাগ সরকারি স্কুলের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় ৷ ক্লাসের সময় কোনো শিক্ষার্থীকে পবিত্র কোরআন পড়তে হয় না বা কোনো ইসলামিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হয় না ৷
বস্তুত, সহশিক্ষা কার্যক্রমের এই মাদ্রাসার ১,২০০ শিক্ষার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই হিন্দু, খ্রিস্টান বা প্রকৃতি-পূজারী ৷ এমনকি এর ৩০ জন শিক্ষকের মধ্যে দশজন হিন্দু ৷ মাদ্রাসাটি আধুনিক পাঠক্রম অনুসরণ করে, যা সম্ভবত ব্যাখ্যা করে যে কেন এটি অমুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় ৷
মাদ্রাসাগুলোকে সাধারণত শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য স্কুল হিসেবে বিবেচনা করা হতো যেখানে শিশুরা কেবলমাত্র ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে লেখাপড়া করে এবং অবশেষে ধর্মীয় শিক্ষক বা ভবিষ্যতে ধর্মীয় আলেমে পরিণত হয় ৷
আল-কায়েদার সন্ত্রাসবাদের প্রাক্কালে, অমুসলিম বিশ্বের অনেকেই দক্ষিণ এশিয়ার হাজার হাজার মাদ্রাসাকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল, এগুলোকে মৌলবাদী ইসলামের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছিল ৷
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, অনেক স্কুলই এই বাঁধাধরা ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসছে ৷ পশ্চিমবঙ্গে সরকারিভাবে স্বীকৃত প্রায় ৬০০ মাদ্রাসা আধুনিক পাঠক্রম চালু করেছে, এবং এগুলোর প্রায় সবগুলোতেই অমুসলিম শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করছে ৷
বর্তমানে, রাজ্যের আধুনিককৃত মাদ্রাসাগুলোর প্রায় ২০% শিক্ষার্থী অমুসলিম, এবং তাদের অনেকেই প্রকৌশলী, ডাক্তার ও বিজ্ঞানী হতে চায় ৷
“এটা মূলত তাদের আধুনিক পাঠক্রম যা অমুসলিমদেরকে এই সব মাদ্রাসাগুলোতে আকৃষ্ট করছে,” খবর দক্ষিণ এশিয়াকে বলেছেন অরগ্রাম মাদ্রাসার হেডমাস্টার আনোয়ার হোসেইন ৷
“সাধারণ মানুষ মনে করে মাদ্রাসা হলো এমন একটি জায়গা যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিষয়গুলো শিক্ষা দেয়া হয় এবং এর সাথে আধুনিক শিক্ষার কোনো সংযোগ নেই,” বলেছেন তিনি ৷ “তাদের ধারণা বদলানোর জন্য আমরা কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে আসছি ৷ আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে আমরা সবগুলো সাধারণ বিষয়েই পাঠদান করছি যেগুলো সাধারণ স্কুলের শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছে”৷
অরগ্রাম এবং অনুরূপ মাদ্রাসাগুলো পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও অন্যান্য সাধারণ বিষয়গুলোতে পাঠদান করে থাকে ৷ শিক্ষার্থীদের জন্য ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বাধ্যতামূলক ৷ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আরবি ভাষা ও ইসলামী শিক্ষা বিষয়েও পাঠদান করা হয় ৷
রাজ্যের তহবিলে পরিচালিত, মূলত গ্রামীণ মাদ্রাসাগুলোতে কোনো ফি রাখা হয় না, এবং শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে স্কুলের ইউনিফর্ম এবং দুপুরের খাবার সরবরাহ করা হয়, এবং এর মাধ্যমে এগুলোকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা হয় ৷
অনেকেই বলেন, মুসলমানরা মাদ্রাসা থেকে পাস করে ক্রমবর্ধমানভাবে নিজেদেরকে পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে - এমন একটি উদাহরণ তৈরি করছে যা অমুসলিমদেরকেও উদ্বুদ্ধ করছে ৷ আরো বেশি বেশি বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে মুসলিম স্কুলগুলোতে পাঠানোর সম্ভাবনা যাচাই করে দেখছেন ৷
“কিছুদিন আগে পর্যন্ত, এই হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ মাদ্রাসার প্রতি অনীহা ছিল যার ফলে অমুসলিম শিক্ষার্থীরা এই সব ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দূরে থাকতো,” বলেছেন ড. হুমায়ূন কবীর, একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ যিনি একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিলেন ৷ “কিন্তু এখন তারা জানে যে মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থীর জন্য ভবিষ্যতে, ডাক্তার, প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানী হওয়াটা কঠিন কিছু নয়, এবং সেই কারণে তারা এখন তাদের ছেলেমেয়েদেরকে মাদ্রাসায় পাঠানো শুরু করেছে”৷
কিছু হিন্দু শিক্ষার্থী বলছেন যে তাদের মাদ্রাসা শিক্ষা তাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে সাহায্য করেছে এবং তাদেরকে মুসলমানদের আরো কাছে নিয়ে গেছে, যা তাদেরকে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহাসিক ব্যবধান আংশিকভাবে হলেও ঘোচাতে সাহায্য করছে ৷
“মাদ্রাসায় পড়তে আসার আগে, আমাকে বলা হয়েছিল যে ইসলাম একটি জঙ্গি ধর্ম এবং মুসলমানরা হিন্দুদের বন্ধু হতে পারে না ৷ তারা আরো বলেছিল যে মুসলমানরা অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী,” খবরকে বলেছেন অরগ্রাম মাদ্রাসার দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী উত্তম মিস্ত্রি ৷
“কিন্তু এখন আমি দেখছি যে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে মানুষের অনেক ভুল ধারণা রয়েছে”৷ একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণী ব্যানার্জি তার সাথে একমত ৷
“কয়েক বছর ধরে এই মাদ্রাসায় পড়ার পর আমি জানি যে অন্য সবগুলো ধর্মকে সম্মান করার জন্য ইসলাম মুসলমানদেরকে শিক্ষা দেয়,” খবরকে বলেছেন তিনি ৷ “আমি বিশ্বাস করি, আমার সারাজীবন ধরে আমি হিন্দু থাকলেও, ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে আমার একটা বিশেষ বন্ধন থাকবে”৷


No comments:

Post a Comment