Friday, November 23, 2012

কানাডিয়ান স্কুল পদ্ধতি ও নয়া অভিবাসী

কানাডিয়ান স্কুল পদ্ধতি ও নয়া অভিবাসী
তাওহীদ নোমান
১৫ মে ২০১০ এটিএন বাংলার ঢাকা টেলিভিশনের গ্রামীন ফোন লীড নিউজ দেখছিলাম। জ,ই, মামুন ভিকারুন নেসা স্কুলের অধ্যক্ষা রোকেয়া আক্তারের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। বিষয়বস্ত ছিলো ২০১০ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল। এবারের ফলাফল বেশ ভালো অর্থাৎ পাশের হার ৭৯%। ভালো স্কুলগুলোর শতকরা ৮০ থেকে ১০০ ভাগ ছাত্র-ছাত্রীরা গড় মার্ক শতকরা ৮০ বা জিপিএ ৫ পেয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে ২৫ মিলিয়ন বা ২.৫ কোটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক লেভেলের ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে যার একটা মোটা অংশ প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে দেশ ও বিদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে জায়গা করে নেয়।
শিক্ষাবিষয়ে লেখার জন্য অনেক বিষয় আমি বিগত ১৫ বছরে উল্লেখ করেছি তবে এই নিবন্ধের বিষয়বস্ত হছে কিভাবে বাংলাদেশ থেকে বা অন্য দেশ থেকে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা ও অভিভাবক্গন কানাডা এসে আঞ্চলিক পদ্ধতি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বহন করে কিংবা স্কুল পদ্ধতি ও স্কুল অধ্যক্ষ, শিক্ষক, ট্রাস্টিদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করা দরকার সেই বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করবো।
শুরুতে বলছি কানাডা-আমেরিকা ও ইউরোপের স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক ভাগ্যবান/ভাগ্যবতী। কারণগুলো হচ্ছেঃ
১। বাংলাদেশে ভালো স্কুলের শ্রেনীকক্ষে গড় ছাত্র-ছাত্রী ৭০ জন, সেখানে কানাডাতে এই সংখ্যা হচ্ছে গড়ে ২৫ জন।
২। কানাডাতে মাথাপিছু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সরকারের খরচ সাত হাজার ডলার, যেটা বাংলাদেশে বছরে সাতশ ডলারও হবেনা।
৩। উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোতে সপ্তম হতে দ্বাদশ গ্রেড প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য “দিক-নির্দেশনা শিক্ষক” বা স্কুলে গাইডেন্স বিভাগ এবং দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক বা স্কুলে স্পেশাল এডুকেশন বিভাগ রয়েছে যেখানে বাংলাদেশে এই বিষয়গুলোতে যথেষ্ট গবেষণা বা প্রতিটি স্কুলে পারদর্শী শিক্ষক বা বিষয় নেই।
৪। উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোতে আধুনিক পাঠাগার, ইনডোর/আউটডোর খেলার মাঠ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে ল্যাবরেটরী রয়েছে যেখানে বাংলাদেশের ৬৮০০০ গ্রামের স্কুলগুলোতে টিনের ছাদ বা দেওয়াল নেই এবং সারাদেশে ছাত্র-ছাত্রীদের সপ্তম বা নবম গ্রেড থেকে যথার্থ এভালুয়েশন অনুযায়ী একাডেমিক উচ্চশিক্ষা বা কারিগরী কর্মশিক্ষার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত দান বা তৈরী করা হয়না।
এবার আসছি শিরোনাম অনুযায়ী নিবন্ধের বিষয়বস্তুর উপর কিছু তথ্য পরিবেশনার মাধ্যমেঃ
কানাডাতে অভিবাসী বাংলাদেশী ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিভাবকবর্গ মনে করেন সন্তানরা স্কুল থেকে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক বাড়ীতে নিয়ে আসেনা। রাশিয়ান অভিভাবকরা মনে করেন বছরে ৩টি রিপোর্ট কার্ড না দিয়ে স্কুল প্রতি সপ্তাহে শিক্ষক মারফৎ রিপোর্ট পাঠাবেন। পাকিস্তানী অভিভাবকগন মনে করেন সন্তানের শিক্ষকের সাথে দেখা করতে এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া খুবই অন্যায় বা বিরক্তিকর।
বাস্তবে কানাডার সর্বোচ্চ শিক্ষা বোর্ড টরন্টো পাবলিক স্কুলগুলো সর্বোচ্চ সংখ্যক অভিবাসী অভিভাবকদের স্কুল শিক্ষা বিষয়ক সন্তানদের যে-কোন সমস্যা ও সমাধানের জন্য প্রতিটি স্কুলে নিজ ভাষাতে স্কুল সেটেলমেন্ট ওয়ার্কার রয়েছেন, যারা নবাগতদের জন্য স্কুল শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষা বোর্ডের প্রয়োজনীয় নবাগত অভিবাসীদের জন্য লিখিত কপি ছাপানো বাংলা ও অন্য ভাষায় তৈরী ও প্রদান করে থাকেন এবং পাশাপাশি স্কুল সেটেলমেন্ট কর্মজ়ীবিরা দৈনিক ফোনে ও সরাসরি একক সেবাদান ও মাসিক দলীয় বিভিন্ন শিক্ষা বিষয়ে (যেমনঃ কারিকুলাম, রিপোর্ট কার্ড, স্কুল ও শিক্ষা পদ্ধতি ইত্যাদি) কর্মশালার আয়োজন করেন, যেখানে স্বভাষী স্কুল-শিক্ষক ও কমিউনিটির সমাজকর্মীরা বা শিক্ষাবিষয়ে পারদর্শী প্রফেশনালরা যোগ দান করে থাকেন।
শিক্ষা বোর্ডের ওয়েব-সাইটে (www.tdsb.on.ca) এবং টরন্টো আঞ্চলিক বাংলাদেশী-কানাডীয়ান শিক্ষকদের সেবাদান সংস্থার ওয়েবসাইটে (www.obecss.org.com)অথবা (www.obecss.webs.com) অনুবাদ করা স্কুল সংক্রান্ত নির্দেশিকার পরও অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলের কোন সমস্যার জন্য শিক্ষক/অধ্যক্ষ/ট্রাস্টি/সুপারিন্টেনডেন্টদের মধ্যে কার সাথে যোগাযোগ করবেন তা বিস্তারিত দেওয়া আছে। এছাড়াও ২০০০সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত obecss সদস্য বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের শিক্ষকরা স্কুল টাইমের ভিতরে ও বাইরে সরাসরি ফোনে, ই-মেইলে (obecss@gmail.com) বা কর্মশালায় যোগ দিয়ে স্কুল ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবকবর্গ এবং স্কুল সেটেলমেন্ট ওয়ার্কারদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে থাকেন।
অধিকাংশ নবাগত এবং স্থানীয় ব্যাকগ্রাউন্ড পুরাতন অভিভাবকরা এখনও জানেননা যে প্রতি স্কুলে তাদের জন্য স্কুল কাউন্সিল বছরে অন্তত ৪টি দু’ঘন্টার সভার আয়োজন করেন বিভিন্ন ছাত্র-ছাত্রী ও স্কুল বিষয়ে অভিভাবকদের পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলের উন্নতি সাধনের জন্য। যে সকল অভিভাবকরা স্কুল কাউন্সিল সদস্য থেকে চেয়ারপার্সন হবেন তারা শুধু সন্তান ও স্কুলের সমস্যা সমাধান নয় এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ এ নিজস্ব মিউনিসিপাল ওয়ার্ডের পাবলিক স্কুল ট্রাস্টির জন্য তৈরী এবং নির্বাচনে জিতলে আরো চার বছর পর নির্বাচনে সিটি কাউন্সিলর এবং আরও চার বছর পর নির্বাচনে প্রাদেশিক এম পি বা কেন্দ্রীয় এম পি প্রার্থী মনোনয়ন কিংবা নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে প্রবাসে বাংলাদেশীদের জন্য ইতিহাস রচনা করতে পারেন।
সন্তানের স্কুল কাউন্সিলের সদস্য ও চেয়ার পার্সন হওয়ার প্রয়োজন পাবলিক শিক্ষাবোর্ডের বিভিন্ন বিষয়ে নীতিমালা, বিধিমালা, প্রক্রিয়া বা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো বোর্ডের ওয়েবসাইটে গিয়ে গবেষণা ও পড়াশোনা করা। যেমন, নিজস্ব ওয়ার্ডের পাবলিক স্কুল ট্রাস্টি ও সন্তানের স্কুল কাউন্সিলে অংশগ্রহন করার জন্য প্রয়োজন “Parent and community involvement” operational procedure PR 588 SCS ডকুমেন্টটি গড়া, বোঝা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা।
সুখবর হচ্ছে, মূলধারার শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশী-কানাডীয়ান শিক্ষক, সমাজকর্মী, মিডিয়া, ব্যবসা, আইন, হিসাব-বিজ্ঞান, প্রকৌশলী, স্বাস্থ্যসেবার কিছু কমিউনিটি ওয়ার্কার ও নেতাকর্মী এই বিষয়ে চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ ও যথাযথভাবে কাজ করে যাচ্ছেন যাতে আগামীতে টরন্টোর প্রায় বিশ হাজার পরিবারের সন্তানদের জন্য মেক্রো লেভেলে Toronto-Bangladeshi Parents Forum এবং মাইক্রো লেভেলে প্রতিটি ওয়ার্ডের হাইস্কুল বা প্রাইমারী স্কুলের স্কুল-কাউন্সিলগুলোতে বা অন্যান্য বিষয়ে এডভাইজরী কমিটিতে আমাদের অভিভাবকরা অংশগ্রহণ করে বাৎসরিক স্কুল কর্মসূচী অনুযায়ী কাউন্সিল সভা, কারিকুলাম নাইট, রিপোর্ট কার্ডের পর অভিভাবক ইন্টারভিউ ইত্যাদি অংশগ্রহনের মাধ্যমে নিজেদের ও অন্যান্য স্বদেশী/স্বভাষী অভিভাবকদের সাহায্য করতে পারেন।
সূত্রঃ 1.Title: Newcomer battled by school system, Toronto Star, Education Reporter-Christive Rushowy
2. লেখকের ১৬ বছরের পাবলিক স্কুল শিক্ষকতা ও সমাজকর্মী হিসাবে অভিজ্ঞতা।

No comments:

Post a Comment